সরাসরি মূল অংশে যান

রাজা রামমোহন রায়ের জীবনী

5 মিনিট

রাজা রামমোহন রায় (১৭৭২ থেকে ১৮৩৩) ছিলেন হুগলির রাধানগরে জন্মানো পণ্ডিত, লেখক ও সমাজসংস্কারক। তিনি একেশ্বরবাদ নিয়ে ফারসি ও বাংলায় লেখেন, উপনিষদ অনুবাদ করেন, সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে প্রচার চালান (১৮২৯ সালে বাংলায় তা নিষিদ্ধ হয়), আধুনিক শিক্ষা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার পক্ষে লেখেন এবং ১৮২৮ সালে ব্রাহ্মসভা প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৩৩ সালে ইংল্যান্ডের ব্রিস্টলে তাঁর মৃত্যু হয়।

এক নজরে রামমোহন রায়: গুরুত্বপূর্ণ সাল তারিখ

সালঘটনা
১৭৭২হুগলি জেলার রাধানগরে জন্ম (প্রচলিত তারিখ ২২ মে; কেউ কেউ ১৭৭৪ বলেন); পিতা রামকান্ত রায়, মাতা তারিণী দেবী
১৮০৩ থেকে ১৮০৪মুর্শিদাবাদ থেকে ফারসি ভাষায় 'তুহফাত উল মুওয়াহহিদীন' প্রকাশ
১৮০৩ থেকে ১৮১৪ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজস্ব বিভাগে কাজ, প্রধানত রংপুরে জন ডিগবির দেওয়ান হিসেবে
১৮১৫কলকাতায় স্থায়ী বসবাস; আত্মীয় সভা গঠন; বেদান্ত ও উপনিষদের বাংলা অনুবাদ শুরু
১৮১৭কলকাতায় হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠা (ডেভিড হেয়ার প্রমুখের উদ্যোগ, যাতে তিনি যুক্ত ছিলেন)
১৮১৮সতীদাহ নিয়ে প্রথম বিতর্ক পুস্তিকা, বাংলা ও ইংরেজিতে
১৮২০'The Precepts of Jesus' প্রকাশ
১৮২১ থেকে ১৮২২বাংলা সাপ্তাহিক 'সম্বাদ কৌমুদী' ও ফারসি 'মিরাত উল আখবার' প্রকাশ
১৮২৩সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণ আইনের প্রতিবাদ; লর্ড আমহার্স্টকে শিক্ষা নিয়ে চিঠি (১১ ডিসেম্বর)
১৮২৮২০ আগস্ট ব্রাহ্মসভা প্রতিষ্ঠা
১৮২৯৪ ডিসেম্বর লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের আইনে বাংলায় সতীদাহ নিষিদ্ধ
১৮৩০মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় আকবরের দূত হিসেবে, 'রাজা' উপাধি নিয়ে, ইংল্যান্ডের পথে যাত্রা
১৮৩৩২৭ সেপ্টেম্বর ব্রিস্টলের কাছে স্টেপলটনে মৃত্যু; সেখানেই সমাধি

শৈশব ও শিক্ষা: ফারসি, আরবি, সংস্কৃত

রামমোহনের জন্ম এক রক্ষণশীল ব্রাহ্মণ পরিবারে, যাঁরা মুঘল ও নবাবি প্রশাসনে কাজ করতেন। সে যুগে সরকারি কাজের ভাষা ছিল ফারসি, তাই ছোটবেলা থেকেই তিনি ফারসি ও আরবি শেখেন। প্রচলিত জীবনী অনুযায়ী পাটনায় ফারসি ও আরবি এবং বেনারসে সংস্কৃত পড়েন; এসব বিবরণের অনেকটাই পরবর্তী জীবনীকারদের লেখা, তাই সব খুঁটিনাটি নিশ্চিত নয়। পরে ইংরেজি শেখেন, আর জীবনের শেষ দিকে গ্রিক ও হিব্রুও কিছুটা পড়েছিলেন।

অল্প বয়সেই প্রতিমাপূজা নিয়ে প্রশ্ন তোলায় পরিবারের সঙ্গে তাঁর বিরোধ হয়। পরে সম্পত্তি নিয়ে আত্মীয়দের সঙ্গে মামলাও হয়।

একেশ্বরবাদ ও ব্রাহ্মসভা

রামমোহনের প্রথম পরিচিত বই 'তুহফাত উল মুওয়াহহিদীন' (একেশ্বরবাদীদের প্রতি উপহার), ফারসিতে লেখা, ভূমিকা আরবিতে। এতে তিনি যুক্তি দেন, সব ধর্মের মূলে এক ঈশ্বরের ধারণা, আর আচার অনুষ্ঠান পরে যুক্ত হয়েছে। কলকাতায় এসে তিনি বেদান্তসূত্র এবং ঈশ, কেন, কঠ, মুণ্ডক প্রভৃতি উপনিষদ বাংলা ও ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। তাঁর দাবি ছিল, উপনিষদ এক নিরাকার ব্রহ্মের উপাসনা শেখায়, প্রতিমাপূজা পরবর্তী সংযোজন।

১৮২৮ সালের ২০ আগস্ট তিনি ও তাঁর সহযোগীরা কলকাতায় ব্রাহ্মসভা প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে মূর্তি ছাড়া এক ঈশ্বরের উপাসনা হত। তাঁর মৃত্যুর পর দ্বারকানাথ ঠাকুরের পুত্র দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এর নেতৃত্ব নেন, আর এটিই পরে ব্রাহ্ম সমাজ নামে পরিচিত হয়। দেবেন্দ্রনাথের ছেলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই পরিবেশেই বড় হন।

যিশুর নৈতিক শিক্ষার প্রশংসা করে লেখা 'The Precepts of Jesus' (১৮২০) বইয়ে তিনি ত্রিত্ববাদ আর অলৌকিক ঘটনা বাদ দেন। এতে শ্রীরামপুরের ব্যাপটিস্ট মিশনারিদের সঙ্গে দীর্ঘ বিতর্ক বাধে। অর্থাৎ তিনি হিন্দু গোঁড়ামি আর খ্রিস্টান গোঁড়ামি দুয়েরই সমালোচক ছিলেন।

সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে লড়াই

সতীদাহ ছিল স্বামীর মৃত্যুর পর বিধবাকে স্বামীর চিতায় পুড়িয়ে মারার প্রথা। উনিশ শতকের গোড়ায় বাংলায়, বিশেষত কলকাতার আশপাশে, এর ঘটনা অনেক বেশি নথিভুক্ত হচ্ছিল। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী ১৮১১ সালে রামমোহনের বড় ভাইয়ের স্ত্রীকে সহমরণে যেতে বাধ্য করা হয় এবং তা দেখে তিনি এই প্রথার বিরুদ্ধে লড়ার প্রতিজ্ঞা করেন। এই ঘটনার সমকালীন নথি নেই, তাই একে প্রচলিত কাহিনি হিসেবেই পড়া উচিত।

নিশ্চিত যা জানা যায়: ১৮১৮ ও ১৮২০ সালে তিনি 'সহমরণ বিষয়ে প্রবর্তক ও নিবর্তকের সম্বাদ' নামে দুটি বিতর্ক পুস্তিকা লেখেন, ইংরেজিতে 'Conference between an Advocate for and an Opponent of the Practice of Burning Widows Alive'। সেখানে শাস্ত্র থেকেই যুক্তি দেন যে শাস্ত্র সহমরণ বাধ্যতামূলক করেনি, বিধবার সংযমী জীবনকে বড় বলেছে, আর বাস্তবে বহু ক্ষেত্রেই মেয়েদের জোর করে চিতায় তোলা হয়। ১৮২২ সালে তিনি হিন্দু নারীর সম্পত্তির অধিকার নিয়েও লেখেন।

১৮২৯ সালের ৪ ডিসেম্বর গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের আইনে (রেগুলেশন সতেরো) বাংলায় সতীদাহ দণ্ডনীয় অপরাধ হয়। রক্ষণশীলরা ধর্মসভা গড়ে এই আইন বাতিলের জন্য লন্ডনের প্রিভি কাউন্সিলে আবেদন করে; ১৮৩২ সালে সেই আবেদন খারিজ হয়, আর রামমোহন তখন ইংল্যান্ডে থেকে আইনের পক্ষে কাজ করেন।

আধুনিক শিক্ষা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা

১৮২৩ সালে সরকার কলকাতায় একটি সংস্কৃত কলেজ খোলার পরিকল্পনা করলে রামমোহন গভর্নর জেনারেল লর্ড আমহার্স্টকে চিঠি লিখে তার বিরোধিতা করেন। তিনি চেয়েছিলেন গণিত, প্রাকৃতিক দর্শন, রসায়ন আর শারীরবিদ্যার শিক্ষা।

“ছাত্ররা সেখানে শিখবে দুই হাজার বছর আগে যা জানা ছিল, তার সঙ্গে পরে যোগ হওয়া অসার ও শূন্যগর্ভ সূক্ষ্ম তর্ক।”
লর্ড আমহার্স্টকে লেখা চিঠি, ১১ ডিসেম্বর ১৮২৩ (মূল ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদ)

একই বছর সরকার সংবাদপত্র প্রকাশে লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করলে তিনি সুপ্রিম কোর্টে ও রাজার কাছে আবেদন করেন এবং প্রতিবাদে নিজের ফারসি পত্রিকা 'মিরাত উল আখবার' বন্ধ করে দেন। তাঁর যুক্তি ছিল, স্বাধীন সংবাদপত্র সরকার আর প্রজা দুয়েরই উপকার করে। কলকাতায় তিনি অ্যাংলো হিন্দু স্কুলও চালাতেন।

ইংল্যান্ড যাত্রা ও ব্রিস্টলে মৃত্যু

১৮৩০ সালে মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় আকবর তাঁকে 'রাজা' উপাধি দিয়ে নিজের ভাতা বাড়ানোর দাবি নিয়ে ইংল্যান্ডে পাঠান। ১৮৩১ সালে লন্ডনে পৌঁছে তিনি পার্লামেন্টের সিলেক্ট কমিটির সামনে ভারতের রাজস্ব ও বিচারব্যবস্থা নিয়ে সাক্ষ্য দেন, ১৮৩২ সালে ফ্রান্সেও যান। ১৮৩৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ব্রিস্টলের কাছে স্টেপলটনে, ইউনিটেরিয়ান বন্ধু কার্পেন্টার পরিবারের কাছে থাকার সময়, জ্বরে তাঁর মৃত্যু হয়। ১৮৪৩ সালে দ্বারকানাথ ঠাকুর ব্রিস্টলের আর্নস ভেল সমাধিক্ষেত্রে তাঁর জন্য ছত্রি আকারের সমাধিসৌধ তৈরি করান।

সমালোচনা ও মূল্যায়ন

রামমোহনকে প্রায়ই 'বাংলার নবজাগরণের অগ্রদূত' বা 'আধুনিক ভারতের জনক' বলা হয়। কিন্তু ইতিহাসবিদদের মধ্যে ভিন্নমতও আছে। কেউ কেউ বলেন, তিনি ছিলেন কোম্পানি শাসনের সুবিধাভোগী শিক্ষিত অভিজাত শ্রেণির মানুষ; ১৮৩২ সালে তিনি ভারতে ইউরোপীয়দের বসতি স্থাপনের পক্ষে লেখেন, যা নিয়ে বিতর্ক আছে। আবার কারও মতে তিনি হিন্দু ধর্মকে বাইরে থেকে আক্রমণ করেননি, বরং শাস্ত্রের ভেতর থেকেই সংস্কারের যুক্তি খুঁজেছেন। দুই দিকই জেনে নিজের মত তৈরি করাই ভালো।

তাঁর যুক্তি কেমন শোনাত, তা বুঝতে Yuga অ্যাপে (iPhone ও Android) রাজা রামমোহন রায়ের এআই পুনর্নির্মাণকে বাংলায় প্রশ্ন করে দেখতে পারো, যেমন সতীদাহ নিয়ে তিনি শাস্ত্রের কোন যুক্তি দিতেন। এটি তাঁর লেখা ও ঐতিহাসিক নথি থেকে তৈরি, কিন্তু আসল মানুষ নয় এবং ভুল করতে পারে। প্রবন্ধে তাঁর মূল রচনা আর জীবনীগ্রন্থ উদ্ধৃত করো। আরও পড়ো: জগদীশচন্দ্র বসুর জীবনী।

মানুষ যা জানতে চান

রাজা রামমোহন রায় কবে ও কোথায় জন্মগ্রহণ করেন?
প্রচলিত মতে ১৭৭২ সালের ২২ মে, তখনকার বাংলার হুগলি জেলার রাধানগর গ্রামে। কিছু জীবনীকার জন্মসাল ১৭৭৪ বলেন। তাঁর পিতা রামকান্ত রায় ও মাতা তারিণী দেবী। তিনি ১৮৩৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ইংল্যান্ডের ব্রিস্টলের কাছে মারা যান।
সতীদাহ প্রথা কবে নিষিদ্ধ হয়?
১৮২৯ সালের ৪ ডিসেম্বর গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের জারি করা আইনে বাংলা প্রেসিডেন্সিতে সতীদাহ দণ্ডনীয় অপরাধ ঘোষিত হয়। রামমোহন রায় ১৮১৮ সাল থেকে লেখা ও প্রচারের মাধ্যমে এর পক্ষে জনমত তৈরি করেছিলেন, আর ১৮৩২ সালে আইনটি বাতিলের আবেদন প্রিভি কাউন্সিলে খারিজ হয়।
রামমোহন রায় কবে ব্রাহ্মসভা প্রতিষ্ঠা করেন?
১৮২৮ সালের ২০ আগস্ট কলকাতায়। এখানে মূর্তি ছাড়া এক নিরাকার ঈশ্বরের উপাসনা হত। তাঁর মৃত্যুর পর দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এর হাল ধরেন এবং এটি ব্রাহ্ম সমাজ নামে বাংলার সমাজ ও শিক্ষায় বড় ভূমিকা নেয়।
রামমোহন রায়কে 'রাজা' উপাধি কে দেন?
মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় আকবর, ১৮৩০ সালে। সম্রাট তাঁকে নিজের দূত করে ইংল্যান্ডে পাঠান, যাতে তিনি ব্রিটিশ সরকারের কাছে সম্রাটের ভাতা বাড়ানোর দাবি জানান। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ উপাধিটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার না করলেও তিনি রাজা রামমোহন রায় নামেই পরিচিত হন।

উৎস

  • Rammohun Roy, Conference between an Advocate for and an Opponent of the Practice of Burning Widows Alive (1818)
  • Rammohun Roy, Letter to Lord Amherst on Education, 11 December 1823
  • Sophia Dobson Collet, The Life and Letters of Raja Rammohun Roy (1900)
  • Mary Carpenter, The Last Days in England of the Rajah Rammohun Roy (1866)
  • ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, রামমোহন রায় (সাহিত্য সাধক চরিতমালা, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ)