সরাসরি মূল অংশে যান

আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর জীবনী

5 মিনিট

জগদীশচন্দ্র বসু (৩০ নভেম্বর ১৮৫৮ থেকে ২৩ নভেম্বর ১৯৩৭) ছিলেন পদার্থবিজ্ঞানী ও উদ্ভিদশারীরবিদ, আন্তর্জাতিক খ্যাতি পাওয়া প্রথম দিকের ভারতীয় আধুনিক বিজ্ঞানীদের একজন। ১৮৯০ এর দশকে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে তিনি মিলিমিটার মাপের বেতার তরঙ্গ তৈরি ও শনাক্ত করেন। পরে উদ্ভিদের সাড়া মাপতে ক্রেস্কোগ্রাফের মতো যন্ত্র বানান এবং ১৯১৭ সালে বসু বিজ্ঞান মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন।

এক নজরে জগদীশচন্দ্র বসু: গুরুত্বপূর্ণ সাল তারিখ

সালঘটনা
১৮৫৮৩০ নভেম্বর ময়মনসিংহে জন্ম; পৈতৃক বাড়ি বিক্রমপুরের রাঢ়িখাল; পিতা ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ভগবানচন্দ্র বসু
১৮৭৯কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে বি এ
১৮৮০চিকিৎসাবিদ্যা পড়তে লন্ডনে যাত্রা; অসুস্থতার জন্য ছেড়ে দেন
১৮৮৪কেমব্রিজের ক্রাইস্টস কলেজ থেকে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে ট্রাইপস এবং লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি এসসি
১৮৮৫প্রেসিডেন্সি কলেজে পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক
১৮৮৭অবলা দাসের (পরে অবলা বসু) সঙ্গে বিবাহ
১৮৯৫কলকাতায় প্রকাশ্যে বৈদ্যুতিক তরঙ্গের পরীক্ষা প্রদর্শন
১৮৯৬লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি এসসি
১৮৯৭লন্ডনের রয়্যাল ইনস্টিটিউশনে বৈদ্যুতিক তরঙ্গ নিয়ে বক্তৃতা
১৯০২'Response in the Living and Non-Living' বই প্রকাশ
১৯০৪আমেরিকায় ডিটেক্টরের পেটেন্ট (US 755,840)
১৯১৫প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে অবসর
১৯১৭নাইট উপাধি; ৩০ নভেম্বর বসু বিজ্ঞান মন্দির প্রতিষ্ঠা
১৯২০রয়্যাল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত
১৯৩৭২৩ নভেম্বর গিরিডিতে মৃত্যু

শৈশব: পাঠশালা থেকে কেমব্রিজ

জগদীশচন্দ্রের বাবা ভগবানচন্দ্র বসু ছিলেন ব্রিটিশ সরকারের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট, তবু ছেলেকে তিনি প্রথমে ইংরেজি স্কুলে না পাঠিয়ে ফরিদপুরের গ্রামের বাংলা পাঠশালায় দেন। সেখানে কৃষক আর জেলের ছেলেদের সঙ্গে পড়ে মাতৃভাষা আর প্রকৃতির সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ পরিচয় হয়। পরে তিনি নিজেই এই অভিজ্ঞতাকে তাঁর জীবনের ভিত্তি বলে উল্লেখ করেছেন। ছোটবেলায় মহাভারতের কর্ণের চরিত্র তাঁকে খুব টানত: পরাজয়ের মধ্যেও যে মানুষ সৎ থাকে।

কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে ফাদার ইউজিন লাফোঁর কাছে তিনি পদার্থবিদ্যায় আগ্রহী হন। ১৮৮০ সালে ডাক্তারি পড়তে লন্ডনে যান, কিন্তু শবব্যবচ্ছেদ কক্ষের পরিবেশে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তারপর কেমব্রিজে প্রাকৃতিক বিজ্ঞান পড়েন, যেখানে শিক্ষক ছিলেন পদার্থবিদ লর্ড র‍্যালে।

বেতনের প্রতিবাদ: তিন বছর বিনা বেতনে অধ্যাপনা

১৮৮৫ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দিয়ে জগদীশচন্দ্র দেখেন, একই পদে ইউরোপীয় অধ্যাপকদের চেয়ে ভারতীয়দের বেতন অনেক কম, আর অস্থায়ী পদ বলে তাঁর বেতন আরও কাটা হচ্ছে। প্রতিবাদে তিনি প্রায় তিন বছর বেতন নিতে অস্বীকার করেন এবং বিনা বেতনে পড়াতে থাকেন। শেষে কর্তৃপক্ষ তাঁর পদ স্থায়ী করে এবং বকেয়া পুরো বেতন দেয়।

কলেজে আলাদা গবেষণাগার ছিল না। ছোট একটি ঘরে, নিজের টাকায় আর স্থানীয় কারিগরদের সাহায্যে তিনি যন্ত্র বানাতেন।

ক্ষুদ্র বেতার তরঙ্গ নিয়ে তাঁর আসল কাজ

১৮৮৮ সালে জার্মান বিজ্ঞানী হাইনরিখ হার্ৎস বৈদ্যুতিক তরঙ্গের অস্তিত্ব প্রমাণ করেন। জগদীশচন্দ্র ১৮৯৪ থেকে এই তরঙ্গ নিয়ে কাজ শুরু করেন এবং অনেক ছোট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের, মিলিমিটারের কাছাকাছি মাপের, তরঙ্গ তৈরি করেন। তিনি দেখান, এই তরঙ্গ আলোর মতোই প্রতিফলিত, প্রতিসৃত আর সমবর্তিত হয়। এর জন্য তিনি বানান ছোট আকারের প্রেরক, ওয়েভগাইড, হর্ন অ্যান্টেনা আর গ্যালেনা নামের খনিজ দিয়ে তৈরি সংবেদনশীল ডিটেক্টর, যা অর্ধপরিবাহী ডিটেক্টরের প্রথম দিকের উদাহরণ।

১৮৯৫ সালে কলকাতায় এক প্রকাশ্য প্রদর্শনীতে তাঁর তরঙ্গ দেওয়াল ভেদ করে দূরের যন্ত্রে সাড়া জাগায় বলে বিবরণ পাওয়া যায়। ১৮৯৭ সালে লন্ডনের রয়্যাল ইনস্টিটিউশনে তিনি এই গবেষণা নিয়ে বক্তৃতা দেন। ২০১২ সালে আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইইই তাঁর ১৮৯৪ থেকে ১৮৯৬ সালের মিলিমিটার তরঙ্গের পরীক্ষাকে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

তিনি আবিষ্কারকে ব্যবসার জিনিস ভাবতে চাইতেন না। বন্ধুদের চাপে শেষ পর্যন্ত ১৯০১ সালে আমেরিকায় ডিটেক্টরের পেটেন্টের আবেদন করেন, যা ১৯০৪ সালে মঞ্জুর হয়। এটিকে কোনো ভারতীয়ের পাওয়া প্রথম দিকের মার্কিন পেটেন্টগুলোর একটি ধরা হয়।

উদ্ভিদের সাড়া আর ক্রেস্কোগ্রাফ

১৯০০ সালের দিকে জগদীশচন্দ্র লক্ষ করেন, তাঁর ধাতব ডিটেক্টর বারবার ব্যবহারে যেন ক্লান্ত হয়ে পড়ে, আবার বিশ্রামে সেরে ওঠে। এখান থেকে তাঁর প্রশ্ন: জীবিত আর অজীবের সাড়ায় কি মিল আছে? ১৯০২ সালে 'Response in the Living and Non-Living' বইয়ে তিনি দেখান, ধাতু, উদ্ভিদ আর প্রাণীর পেশি উত্তেজনা, অবসাদ আর বিষের প্রভাবে বৈদ্যুতিক সাড়ায় একই রকম আচরণ করে।

উদ্ভিদের খুব ধীর বৃদ্ধি মাপতে তিনি ক্রেস্কোগ্রাফ নামে একটি যন্ত্র তৈরি করেন, যা বৃদ্ধিকে প্রায় দশ হাজার গুণ বড় করে দেখাতে পারত। লজ্জাবতী আর বনচাঁড়ালের মতো উদ্ভিদ নিয়ে তিনি দেখান, উদ্ভিদের কোষেও উদ্দীপনা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় বৈদ্যুতিক সংকেতের মতো ছড়িয়ে যায়।

ব্রিটিশ শারীরবিদ জন বার্ডন স্যান্ডারসন আর অগাস্টাস ওয়ালারের মতো বিজ্ঞানীরা তাঁর কিছু দাবি নিয়ে তীব্র আপত্তি তোলেন। আজকের উদ্ভিদবিজ্ঞান উদ্ভিদের বৈদ্যুতিক সংকেত স্বীকার করে, তবে 'উদ্ভিদের অনুভূতি বা চেতনা আছে' এমন কথা তিনি প্রমাণ করেছিলেন বলা ঠিক নয়।

বসু বিজ্ঞান মন্দির ও বাংলায় বিজ্ঞান লেখা

১৯১৭ সালের ৩০ নভেম্বর, নিজের জন্মদিনে, তিনি কলকাতায় বসু বিজ্ঞান মন্দির (Bose Institute) প্রতিষ্ঠা করেন। উদ্বোধনী ভাষণে তিনি বলেন, এটি হবে গবেষণা আর জ্ঞান প্রচারের জায়গা, সব দেশের গবেষকের জন্য খোলা, কারখানা নয়, মন্দিরের মতো। প্রতিষ্ঠানের খরচের বড় অংশ তিনি নিজের সঞ্চয় থেকে দেন।

জগদীশচন্দ্র বাংলাতেও বিজ্ঞান লিখেছেন। তাঁর প্রবন্ধ সংকলন 'অব্যক্ত' (১৯২১) আজও পড়া হয়। এর মধ্যে আছে 'পলাতক তুফান', যা ১৮৯০ এর দশকে লেখা তাঁর গল্প 'নিরুদ্দেশের কাহিনী'র সংশোধিত রূপ এবং বাংলা ভাষার প্রথম দিকের কল্পবিজ্ঞান গল্পগুলোর একটি।

রবীন্দ্রনাথ, অবলা বসু ও বন্ধুরা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন তাঁর আজীবন বন্ধু। জগদীশচন্দ্র বিদেশে থাকার সময় রবীন্দ্রনাথ তাঁর গবেষণার জন্য অর্থ সংগ্রহে সাহায্য করেন বলে চিঠিপত্রে জানা যায়। স্ত্রী অবলা বসু নিজেই ছিলেন শিক্ষাবিদ ও সমাজসংস্কারক, নারী শিক্ষার জন্য নারী শিক্ষা সমিতি গড়ে তোলেন। আইরিশ বংশোদ্ভূত লেখিকা ভগিনী নিবেদিতা তাঁর ইংরেজি বইগুলোর সম্পাদনায় সাহায্য করেন, আর আমেরিকান সারা চ্যাপম্যান বুল তাঁর গবেষণায় অর্থ সাহায্য করেন।

প্রচলিত ভুল ধারণা: তিনি কি রেডিও আবিষ্কার করেছিলেন?

অনেক জায়গায় লেখা থাকে, রেডিও আবিষ্কার করেছিলেন জগদীশচন্দ্র, মার্কোনি নয়। ইতিহাস এত সহজ নয়। জগদীশচন্দ্র মিলিমিটার তরঙ্গের পদার্থবিদ্যা আর ডিটেক্টর নিয়ে মৌলিক কাজ করেন, কিন্তু দূরে বার্তা পাঠানোর ব্যবস্থা বানিয়ে তার ব্যবসা করার পথে যাননি। মার্কোনি অপেক্ষাকৃত লম্বা তরঙ্গ দিয়ে দূরপাল্লার বেতার যোগাযোগ গড়ে তোলেন। দুজনের কাজ আলাদা, আর দুটোরই নিজস্ব গুরুত্ব আছে। স্কুলের লেখায় বলা ঠিক: তিনি ক্ষুদ্র তরঙ্গ ও অর্ধপরিবাহী ডিটেক্টর গবেষণার পথিকৃৎদের একজন।

তাঁর কাজ নিয়ে আরও প্রশ্ন থাকলে Yuga অ্যাপে (iPhone ও Android) জগদীশচন্দ্র বসুর এআই পুনর্নির্মাণের সঙ্গে বাংলায় কণ্ঠে কথা বলে দেখতে পারো, তিনি নিজের পরীক্ষাগুলো কীভাবে ব্যাখ্যা করতেন। এটি তাঁর লেখা ও ঐতিহাসিক নথি থেকে তৈরি, কিন্তু আসল মানুষ নয় এবং ভুল করতে পারে। প্রকল্পে তাঁর বই আর জীবনীগ্রন্থ উদ্ধৃত করো, অ্যাপ নয়।

মানুষ যা জানতে চান

জগদীশচন্দ্র বসু কী আবিষ্কার করেন?
তিনি মিলিমিটার মাপের ক্ষুদ্র বেতার তরঙ্গ তৈরি ও শনাক্ত করেন এবং দেখান যে এই তরঙ্গ আলোর মতো আচরণ করে। গ্যালেনা দিয়ে অর্ধপরিবাহী ডিটেক্টর বানান, যার মার্কিন পেটেন্ট ১৯০৪ সালে মঞ্জুর হয়। পরে উদ্ভিদের বৈদ্যুতিক সাড়া মাপেন এবং ক্রেস্কোগ্রাফ যন্ত্র তৈরি করেন।
ক্রেস্কোগ্রাফ কী?
ক্রেস্কোগ্রাফ জগদীশচন্দ্র বসুর তৈরি একটি যন্ত্র, যা উদ্ভিদের অতি ধীর বৃদ্ধিকে প্রায় দশ হাজার গুণ বড় করে দেখাতে ও লিখে রাখতে পারত। এর সাহায্যে তিনি দেখান, আলো, তাপ, রাসায়নিক বা আঘাতের মতো উদ্দীপনায় উদ্ভিদের বৃদ্ধি কীভাবে বদলায়।
জগদীশচন্দ্র বসু কবে ও কোথায় জন্মগ্রহণ করেন?
১৮৫৮ সালের ৩০ নভেম্বর, তখনকার বাংলার ময়মনসিংহে, যা এখন বাংলাদেশে। তাঁর পৈতৃক বাড়ি ঢাকার বিক্রমপুরের রাঢ়িখাল গ্রামে। তিনি ১৯৩৭ সালের ২৩ নভেম্বর বিহারের (এখন ঝাড়খণ্ড) গিরিডিতে মারা যান।
বসু বিজ্ঞান মন্দির কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?
১৯১৭ সালের ৩০ নভেম্বর, জগদীশচন্দ্রের ৫৯তম জন্মদিনে, কলকাতায়। ইংরেজিতে এর নাম Bose Institute। তিনি চেয়েছিলেন এটি সব দেশের গবেষকের জন্য খোলা গবেষণা ও জ্ঞান প্রচারের কেন্দ্র হোক। আজও এটি ভারতের অন্যতম পুরোনো গবেষণা প্রতিষ্ঠান।

উৎস

  • J. C. Bose, 'On the Electric Waves', Friday Evening Discourse, Royal Institution, 1897
  • J. C. Bose, Response in the Living and Non-Living (Longmans, Green, 1902)
  • জগদীশচন্দ্র বসু, অব্যক্ত (১৯২১)
  • Patrick Geddes, The Life and Work of Sir Jagadis C. Bose (1920)
  • Subrata Dasgupta, Jagadis Chandra Bose and the Indian Response to Western Science (1999)