সরাসরি মূল অংশে যান

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনী

6 মিনিট

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (৭ মে ১৮৬১ থেকে ৭ আগস্ট ১৯৪১) ছিলেন বাঙালি কবি, গীতিকার, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, চিত্রশিল্পী ও শিক্ষাবিদ। কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে জন্ম। ১৯১৩ সালে ইংরেজি গীতাঞ্জলির জন্য তিনি প্রথম অ-ইউরোপীয় হিসেবে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। শান্তিনিকেতনে বিদ্যালয় ও বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর লেখা গান ভারত ও বাংলাদেশ দুই দেশের জাতীয় সংগীত।

এক নজরে রবীন্দ্রনাথ: গুরুত্বপূর্ণ সাল তারিখ

সালঘটনা
১৮৬১৭ মে (২৫ বৈশাখ ১২৬৮) কলকাতার জোড়াসাঁকোয় জন্ম; পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, মাতা সারদা দেবী
১৮৭৭ভানুসিংহ ছদ্মনামে বৈষ্ণব পদাবলির ধাঁচে কবিতা লেখা শুরু
১৮৭৮ থেকে ১৮৮০ইংল্যান্ডে পড়াশোনার চেষ্টা; ডিগ্রি না নিয়েই দেশে ফেরেন
১৮৮৩মৃণালিনী দেবীর সঙ্গে বিবাহ
১৮৯০ এর দশকশিলাইদহ ও পূর্ববঙ্গের জমিদারি দেখাশোনা; গল্পগুচ্ছের বহু ছোটগল্প রচনা
১৯০১শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মচর্যাশ্রম বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা
১৯০২স্ত্রী মৃণালিনী দেবীর মৃত্যু
১৯০৫বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে রাখিবন্ধন উৎসবের আহ্বান; লেখেন 'আমার সোনার বাংলা'
১৯১০বাংলা গীতাঞ্জলি প্রকাশ
১৯১১'জনগণমন' রচনা; ২৭ ডিসেম্বর কলকাতায় প্রথম গাওয়া হয়
১৯১২লন্ডনে ইংরেজি গীতাঞ্জলি (Song Offerings) প্রকাশ, ভূমিকা লেখেন কবি ডব্লিউ বি ইয়েটস
১৯১৩সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার
১৯১৫ব্রিটিশ সরকারের নাইট উপাধি
১৯১৯জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে নাইট উপাধি ত্যাগ
১৯২১বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠা
১৯৩০ইউরোপে চিত্রপ্রদর্শনী; জার্মানিতে আইনস্টাইনের সঙ্গে আলোচনা
১৯৪১১৪ এপ্রিল 'সভ্যতার সংকট' পাঠ; ৭ আগস্ট (২২ শ্রাবণ ১৩৪৮) জোড়াসাঁকোয় মৃত্যু

জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে শৈশব

রবীন্দ্রনাথ ছিলেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সারদা দেবীর চতুর্দশ সন্তান। দেবেন্দ্রনাথ ছিলেন ব্রাহ্ম সমাজের নেতা, লোকে তাঁকে মহর্ষি বলত। তাঁর পিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুর ছিলেন কলকাতার বড় ব্যবসায়ী। ঠাকুরবাড়িতে নাটক, গান, পত্রিকা আর আলোচনা লেগেই থাকত, আর বড় ভাইবোনেরা প্রায় সবাই সাহিত্য বা সংগীতে যুক্ত ছিলেন।

স্কুল তাঁর একেবারে ভালো লাগত না। ওরিয়েন্টাল সেমিনারি, নর্মাল স্কুল, বেঙ্গল একাডেমি, সেন্ট জেভিয়ার্স, কোনোটাতেই বেশিদিন টেকেননি। পড়াশোনা হয়েছে মূলত বাড়িতে গৃহশিক্ষকের কাছে। ১৮৭৩ সালে বাবার সঙ্গে হিমালয়ের ডালহৌসি পর্যন্ত ভ্রমণ তাঁর ছেলেবেলার বড় অভিজ্ঞতা। এই সময়ের কথা তিনি পরে লিখেছেন 'জীবনস্মৃতি' (১৯১২) আর 'ছেলেবেলা' (১৯৪০) বইয়ে।

শিলাইদহের জমিদারি আর ছোটগল্পের জন্ম

১৮৯০ এর দশকে বাবার নির্দেশে রবীন্দ্রনাথ পূর্ববঙ্গে (আজকের বাংলাদেশে) পরিবারের জমিদারি দেখাশোনা করতে যান। শিলাইদহ, শাহজাদপুর আর পতিসরে পদ্মা ও অন্য নদীতে বোটে ঘুরে তিনি গ্রামের মানুষের জীবন কাছ থেকে দেখেন। এই অভিজ্ঞতা থেকেই 'পোস্টমাস্টার', 'কাবুলিওয়ালা', 'ছুটি', 'সমাপ্তি'র মতো গল্প, যেগুলো পরে 'গল্পগুচ্ছ' নামে সংকলিত হয়। অনেক সমালোচক তাঁকে বাংলা আধুনিক ছোটগল্পের প্রথম বড় শিল্পী মনে করেন।

এই সময়ের চিঠিগুলো, যা 'ছিন্নপত্র' নামে প্রকাশিত, নদী, আকাশ আর মানুষের বিবরণে ভরা। জীবনী লেখার সময় এগুলো একটি ভালো প্রাথমিক উৎস।

শান্তিনিকেতন, বিশ্বভারতী ও শ্রীনিকেতন

১৯০১ সালে রবীন্দ্রনাথ বাবার প্রতিষ্ঠিত শান্তিনিকেতন আশ্রমে মাত্র কয়েকজন ছাত্র নিয়ে একটি বিদ্যালয় শুরু করেন। ক্লাস হত খোলা আকাশের নিচে, গাছের তলায়। মুখস্থ বিদ্যার বদলে তিনি চেয়েছিলেন প্রকৃতি, গান, ছবি আর হাতের কাজের মধ্য দিয়ে শেখা।

১৯২১ সালে এই বিদ্যালয় থেকে গড়ে ওঠে বিশ্বভারতী, যার উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব আর পশ্চিমের জ্ঞানের মিলনক্ষেত্র তৈরি। নোবেল পুরস্কারের অর্থের বড় অংশ তিনি এই কাজে দেন। কাছেই শ্রীনিকেতনে ইংরেজ কৃষিবিদ লেনার্ড এলমহার্স্টের সাহায্যে গ্রাম উন্নয়নের কেন্দ্র গড়ে তোলেন। ১৯৫১ সালে বিশ্বভারতী কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় হয়, আর ২০২৩ সালে শান্তিনিকেতন ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পায়।

গীতাঞ্জলি ও ১৯১৩ সালের নোবেল পুরস্কার

১৯১২ সালে ইংল্যান্ড যাওয়ার পথে রবীন্দ্রনাথ নিজের কিছু কবিতা ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। চিত্রশিল্পী উইলিয়াম রোদেনস্টাইনের মাধ্যমে সেগুলো পৌঁছায় আইরিশ কবি ইয়েটসের হাতে। একই বছর লন্ডনের ইন্ডিয়া সোসাইটি 'Gitanjali: Song Offerings' প্রকাশ করে। এতে বাংলা গীতাঞ্জলি ছাড়াও অন্য কয়েকটি বই থেকে নেওয়া কবিতা ছিল।

১৯১৩ সালের নভেম্বরে সুইডিশ অ্যাকাডেমি তাঁকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার দেয়। তিনিই প্রথম অ-ইউরোপীয় যিনি সাহিত্যে নোবেল পান। ২০০৪ সালে বিশ্বভারতীর সংগ্রহশালা থেকে নোবেল পদকটি চুরি হয়ে যায়, যা আজও উদ্ধার হয়নি; পরে সুইডিশ অ্যাকাডেমি একটি প্রতিলিপি দেয়।

নাইট উপাধি ত্যাগ: চিঠির ভাষায়

১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগে ব্রিটিশ সেনা নিরস্ত্র জনতার উপর গুলি চালায়। পাঞ্জাবে তখন কঠোর সামরিক শাসন, খবরও বাইরে আসছিল না। মে মাসের শেষে রবীন্দ্রনাথ ভাইসরয় লর্ড চেমসফোর্ডকে চিঠি লিখে নাইট উপাধি ফিরিয়ে দেন।

“সময় এসেছে যখন সম্মানের পদকগুলো অপমানের অসংগত প্রেক্ষাপটে আমাদের লজ্জাকে আরও প্রকট করে তোলে, আর আমি নিজের দিক থেকে সমস্ত বিশেষ সম্মান ত্যাগ করে আমার সেই দেশবাসীর পাশে দাঁড়াতে চাই, যাঁরা তথাকথিত তুচ্ছতার কারণে মানুষের অযোগ্য অবমাননার শিকার হতে পারেন।”
লর্ড চেমসফোর্ডকে লেখা চিঠি, মে ১৯১৯ (মূল ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদ)

রবীন্দ্রনাথের প্রধান রচনা

রবীন্দ্রনাথ প্রায় সব ধরনের লেখাই লিখেছেন। কয়েকটি মূল রচনা:

  • কাব্য: মানসী (১৮৯০), সোনার তরী (১৮৯৪), নৈবেদ্য (১৯০১), গীতাঞ্জলি (১৯১০), বলাকা (১৯১৬), পুনশ্চ (১৯৩২)।
  • উপন্যাস: চোখের বালি (১৯০৩), গোরা (১৯১০), ঘরে বাইরে (১৯১৬), শেষের কবিতা (১৯২৯)।
  • নাটক: ডাকঘর (১৯১২), রক্তকরবী (১৯২৬), নৃত্যনাট্য চিত্রাঙ্গদা ও চণ্ডালিকা।
  • গান: দুই হাজারেরও বেশি গান, যা রবীন্দ্রসংগীত নামে পরিচিত, নিজের সুরে।
  • প্রবন্ধ ও বক্তৃতা: ন্যাশনালিজম (১৯১৭), দ্য রিলিজিয়ন অফ ম্যান (১৯৩১), সভ্যতার সংকট (১৯৪১)।
  • ছবি: ষাটের কোঠার শেষ দিকে নিয়মিত আঁকা শুরু করে কয়েক হাজার ছবি আঁকেন; ১৯৩০ সালে প্যারিসে প্রথম বড় প্রদর্শনী।

জাতীয়তাবাদ, মানবতা আর বিজ্ঞান নিয়ে তাঁর ভাবনা

রবীন্দ্রনাথ ব্রিটিশ শাসনের সমালোচক ছিলেন, কিন্তু সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদেরও বিরোধী ছিলেন। ১৯১৭ সালে জাপান ও আমেরিকায় দেওয়া বক্তৃতায় ('Nationalism') তিনি বলেন, পশ্চিমের রাষ্ট্রযন্ত্র ক্ষমতা আর মুনাফার জন্য মানুষের জীবন্ত সমাজকে পিষে ফেলে, ভারতের তা অনুকরণ করা উচিত নয়। ১৯০৮ সালে এক চিঠিতে তিনি লেখেন:

“আমি হীরের দামে কাচ কিনব না, আর যতদিন বেঁচে আছি, দেশপ্রেমকে মানবতার উপরে জয়ী হতে দেব না।”
অরবিন্দমোহন বসুকে লেখা চিঠি, ১৯০৮; Krishna Dutta ও Andrew Robinson সম্পাদিত Selected Letters of Rabindranath Tagore থেকে (বাংলা অনুবাদ)

অসহযোগ আন্দোলনের সময় বিদেশি কাপড় পোড়ানো আর চরকাকে সবার কর্তব্য বানানোর বিরুদ্ধে তিনি 'সত্যের আহ্বান' (১৯২১) ও অন্য প্রবন্ধে আপত্তি জানান; তাঁর মতে অন্ধ আনুগত্য চিন্তাকে রুদ্ধ করে। আর ১৯৩৪ সালে বিহারের ভূমিকম্পকে অস্পৃশ্যতার জন্য দৈব শাস্তি বলে যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছিল, তিনি প্রকাশ্যে তার প্রতিবাদ করেন, কারণ প্রাকৃতিক দুর্যোগকে নৈতিক পাপের সঙ্গে জোড়া কুসংস্কার বাড়ায়।

সাবধান: রবীন্দ্রনাথের নামে ভুয়া উদ্ধৃতি

ইন্টারনেটে রবীন্দ্রনাথের নামে অসংখ্য বাণী ঘোরে, যার অনেকগুলো তাঁর কোনো বইয়ে নেই। স্কুলের প্রবন্ধ বা বক্তৃতায় উদ্ধৃতি দিতে হলে বইয়ের নাম আর কবিতা বা গানের প্রথম লাইন মিলিয়ে নিন। বিশ্বভারতী প্রকাশিত রবীন্দ্র রচনাবলী আর পশ্চিমবঙ্গ সরকারের রবীন্দ্র রচনাবলী সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য।

তাঁর ভাবনা নিজের কানে শুনে বুঝতে চাইলে Yuga অ্যাপে (iPhone ও Android) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এআই পুনর্নির্মাণের সঙ্গে বাংলায় কণ্ঠে বা লিখে কথা বলতে পারো। এটি তাঁর লেখা ও ঐতিহাসিক নথি থেকে তৈরি, কিন্তু আসল মানুষ নয় এবং ভুল করতে পারে। তাই স্কুলের কাজে অ্যাপ নয়, মূল বই আর জীবনীগ্রন্থ উদ্ধৃত করো। শুরু বিনামূল্যে: ১৫ মিনিট কণ্ঠে কথা, তারপর সপ্তাহে ৫ মিনিট, আর প্রতিদিন লেখায় কথা বলা যায়; বয়স ১৩ বা তার বেশি হতে হবে।

রবীন্দ্রনাথের বন্ধু বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর জীবনী আর তাঁর পিতামহের বন্ধু রাজা রামমোহন রায়ের জীবনীও পড়ে দেখতে পারো।

মানুষ যা জানতে চান

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কবে ও কোথায় জন্মগ্রহণ করেন?
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৬১ সালের ৭ মে, বাংলা ১২৬৮ সনের ২৫ বৈশাখ, কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও মাতা সারদা দেবী। তাই প্রতি বছর ২৫ বৈশাখ রবীন্দ্রজয়ন্তী পালিত হয়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কোন বইয়ের জন্য নোবেল পুরস্কার পান?
১৯১৩ সালে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান, মূলত ইংরেজি 'Gitanjali: Song Offerings' এর জন্য, যা ১৯১২ সালে লন্ডনে প্রকাশিত হয়। এতে বাংলা গীতাঞ্জলি ও অন্য কয়েকটি কাব্যগ্রন্থের কবিতার তাঁর নিজের করা গদ্য অনুবাদ ছিল। তিনিই সাহিত্যে নোবেলজয়ী প্রথম অ-ইউরোপীয়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেন নাইট উপাধি ত্যাগ করেন?
১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগে নিরস্ত্র মানুষের উপর গুলি চালানো এবং পাঞ্জাবের দমননীতির প্রতিবাদে। মে মাসের শেষে তিনি ভাইসরয় লর্ড চেমসফোর্ডকে চিঠি লিখে জানান, অপমানিত দেশবাসীর পাশে দাঁড়াতে তিনি সমস্ত বিশেষ সম্মান ত্যাগ করছেন।
রবীন্দ্রনাথের লেখা কোন গান কোন দেশের জাতীয় সংগীত?
ভারতের জাতীয় সংগীত 'জনগণমন' আর বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত 'আমার সোনার বাংলা' দুটোই তাঁর লেখা। 'আমার সোনার বাংলা' ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সময় লেখা। 'জনগণমন' ১৯১১ সালে প্রথম গাওয়া হয় এবং ১৯৫০ সালে ভারতের জাতীয় সংগীত হিসেবে গৃহীত হয়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কবে মারা যান?
১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট, বাংলা ১৩৪৮ সনের ২২ শ্রাবণ, কলকাতার জোড়াসাঁকোর বাড়িতে, ৮০ বছর বয়সে। মৃত্যুর কয়েক মাস আগে, ১৪ এপ্রিল ১৯৪১, তাঁর শেষ বড় প্রবন্ধ 'সভ্যতার সংকট' পাঠ করা হয়। ২২ শ্রাবণ দিনটি এখন বাইশে শ্রাবণ নামে স্মরণ করা হয়।

উৎস